নতুন রোগ পিজিডি এবং মস্তিষ্কের শোক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া

সব দুঃখ যায় না ভোলা : নতুন রোগ পিজিডি

শোকাহত মানুষকে প্রায়ই আমরা স্বান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলি – ‘কিছুটা সময় নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে’। আসলেও কী সময়ে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে আসে? নতুন এক গবেষণা বলছে, সময়ের সঙ্গে সব শোকই যে কেটে যায়, তা নয়। বরং কিছু কষ্ট শিকড় গেড়ে বসতে পারে। এরকমটি হলে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া বা খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘প্রলম্বিত শোকজনিত ব্যাধি’ বা (পিজিডি)।

এটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত। ২০২২ সালেই ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার্স-এ যুক্ত করা হয়েছে নতুন এ রোগটিকে। সহজ ভাষায়, পিজিডি বলতে মূলত এমন এক ধরনের শোককে বোঝায়, যা সময়ের সঙ্গে কমে না এবং একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে থাকে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর প্রোলঙড গ্রিফের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ক্যাথরিন শিয়ার বলেন, ‘এখানে এমন কিছু হয় যা মানুষকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা মেনে নিতে বাধা দেয়। তিনি মানসিকভাবে মানতে পারেন না যে– ঠিক আছে, আমি জানি এটা এমন কিছু যা আমি পরিবর্তন করতে পারি না। আমাকে এটা মেনে নিতে হবে।’

গবেষকরা এখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছেন কেন এমনটা হয়। শুধু গভীর দুঃখ নয়, ২০২৬ সালে ট্রেন্ডস ইন নিউরোসায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, পিজিডি মস্তিষ্কের অ্যাটাচমেন্ট ও রিওয়ার্ড সিস্টেমগুলোর সঙ্গেও জড়িত। মানে এ ধরনের দুঃখ আপনার দৈনন্দিন জীবনে সম্পর্ক গড়ে তোলা ও কোনো কিছু থেকে আনন্দ লাভের মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যাদের প্রলম্বিত শোক রয়েছে, তাদের মস্তিষ্কে এই সিস্টেমগুলো সংকেত দেয় যে প্রিয়জন ফিরে আসবে বা যা চলে গেছে তা আবার ‘ধরা যাবে’। ফলে স্মৃতি ও বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এই অমীমাংসিত সংকেত মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিটিকে মেনে নেওয়া আরও কঠিন করে তোলে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের মনোবিজ্ঞান অধ্যাপক ও এই পর্যালোচনার সহলেখক রিচার্ড ব্রায়ান্ট বলেন, ‘প্রলম্বিত শোক তুলনামূলকভাবে নতুন একটি রোগ। তাই এর নিউরোবায়োলজি বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের প্রমাণভিত্তি এখনও সীমিত।’

বিশেষজ্ঞরা এখন পর্যন্ত পিজিডি কীভাবে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং এর চিকিৎসা কীভাবে করা যায়, সে সম্পর্কে যা যা জানেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রলম্বিত শোকজনিত ব্যাধি কী?

পিজিডি হলো মূলত ‘ক্ষতির প্রতি দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র ও কষ্টদায়ক প্রতিক্রিয়া’, যা শোকজনিত বিষণ্নতা বা উদ্বেগ থেকে আলাদা। উইল কর্নেল মেডিসিনের কর্নেল সেন্টার ফর রিসার্চ অন এন্ড-অফ-লাইফ কেয়ারের পরিচালক হলি প্রিগারসন এভাবেই বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার ভাষ্যে, এই অবস্থায় মানুষ যেন তাদের শোকে আটকে থাকে।

হারানো প্রিয়জনের জন্য স্থায়ী আকুলতা, আবেগগতভাবে অসাড় বা বিচ্ছিন্ন অনুভব করা, নিজের পরিচয় বা আত্মবোধে আঘাত পাওয়া এবং ক্ষতির বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পারার মতো উপসর্গগুলোর মাধ্যমে এটি বুঝা যায়।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান অধ্যাপক এবং ‘দ্য গ্রিভিং ব্রেইন’ বইয়ের লেখক মেরি-ফ্রান্সেস ও’কনর বলেন, এই অভিজ্ঞতাগুলোর বেশ কয়েকটি শোকের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়। তবে অন্যান্য শোকের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে আকুলতা কমে এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু যাদের প্রলম্বিত শোক রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে এই পরিবর্তন আমরা দেখি না।

সাধারণত লক্ষণগুলো ১২ মাসের বেশি স্থায়ী হলে সেটিকে পিজিডি হিসেবে ধরা হয়। ব্রায়ান্ট বলেন, “নানা ধরনের ক্ষতি থেকে প্রলম্বিত শোক তৈরি হতে পারে। যেমন – প্রিয়জনের মৃত্যু, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, পোষা প্রাণীর মৃত্যু ইত্যাদি।

প্রলম্বিত শোক মস্তিষ্কে কীভাবে প্রভাব ফেলে

পিজিডি সংক্রান্ত মস্তিষ্কের কার্যকলাপ এখনও বিষণ্নতা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের মতো ব্যাপকভাবে গবেষণা করা হয়নি বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা।

যা জানা গেছে তা হলো- প্রলম্বিত শোকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবেন এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়েন। এই একই লক্ষণ বিষণ্নতা ও পিটিএসডি-এর ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

মস্তিষ্কের পুরস্কার ও অনুপ্রেরণার সঙ্গে জড়িত অংশগুলো, যেমন- অরবিটোফ্রন্টাল কর্টেক্স, স্ট্রায়াটাম এবং নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স-ব্যাপকভাবে সক্রিয় থাকে। এতে করে ইঙ্গিত মেলে যে মস্তিষ্ক এখনও প্রিয়জনটির উপস্থিতি প্রত্যাশা করছে।

ও’কনর বলেন, ‘গভীর শোকে আক্রান্ত মানুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা যখন প্রিয়জনের একটি ছবি দেখে, তখনও সেই ‘পুরস্কার প্রত্যাশা’ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যেন সেই মানুষটি এখনও আছে।’

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক